Blog Dhaka

অপূর্ণতায় পূর্ণতা…

February 14, 2019

বাইসাইকেলের সাথে আমার সম্পর্কের ধরনটা অনেক অন্যরকম!

শুরু করি ছোটবেলা থেকে… আমার মা বাবার প্রথম সন্তান আমার বড় আপু। তো স্বাভাবিক তার প্রতি ভালোবাসা, আশা, অভিযোগ, শখ সবই একটু বেশি ছিল। তাই তার পিছনে সময়টা একটু বেশি দেয়া। মজার ব্যাপার, সেই অতি সময়ের বড় ভার আমাকে আর বইতে হয়নি। ধন্যবাদ আমার বোনকে।

একা স্কুল, কোচিং, খেলা কিংবা একা একা আয়নায় দাড়িয়ে নিজের সাথে কথা বলার অভ্যাস আমি তৈরি করেছি সেখান থেকেই। এতসব কাজের মাঝে বাবা মায়ের চোখ এড়িয়ে আমি আসলে একটু একটু করে বড় হয়েছি।

এবার বলি, এত কিছু বলার কারণ। আমার গান, নাচ কিংবা নাটক কিছুই শেখার তেমন একটা সুযোগ হয়ে উঠেনি। কারণ বাবা মা প্রয়োজন মনে করেনি। মাঝে মাঝে আমি কবিতার প্রতিযোগিতায় যাওয়ার সুযোগ পেলেও, সময়ের অভাবে আমাকে কেউ নিয়ে যেতে পারতো না। অনেক ক্ষোভ, রাগ ছিল তখন এটা ভেবে যে, আমার সব বান্ধবীদের বাবা মা এতো সময় দিয়ে ওদের পেছনে খেটে বেড়ায়…আর আমি কেন এতো অবহেলায় থাকি?

একদিন কপাল গুনে, আমার বড় মামা আমার মামাতো বোনকে একটা বাইসাইকেল কিনে দিলেন! দেখে মনটা এতোই খারাপ হয়ে গেল, যে আমার মাকে গিয়ে বলে দিলাম যে, আমাকে একটা সাইকেলতো কিনে দিতে পারো! বললাম না! কপালগুনে? আম্মা আব্বাকে বলে একটা সাইকেল কিনেও দিলো। সেদিন যে আমি কতো খুশি। সব দুঃখ, ক্ষোভ, রাগ, সব নিমিষে নাই হয়ে গেল…

শুরু হল আমার সাইকেল শিক্ষা। মজার জীবন!! শুক্রবার সকালে একজন আমাকে সাইকেল শেখাতে আসতো। আমার একাকিত্তের অনেক বড় অংশ আমার সাইকেল। সারাদিন কথা বলি, অপেক্ষা করি, শেখার চেষ্টা করি। এভাবে একদিন শিখেও গেলাম আর বিকেল হলেই ছাদে গিয়ে সাইকেল চালাই।

সপ্তাহখানেকহ পর একদিন ছাদে গিয়ে দেখি, আমার সাইকেল গায়েব! আমার পায়ের নিচে যেন মাটি নাই হয়ে গেল ক্ষণিকের মাঝে। আব্বা অকথ্য ভাষায় আমাকে গালি গালাজ করল!! আমি ভাবলাম, এখানে আমার কি দোষ? রাগে দুঃখে কান্নাও আসলো না সেদিন! আম্মা আমাকে আব্বার গালিগালাজ থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে বলল, তোমাকে আরেকটা সাইকেল কিনে দিবো।

আমার মা অনেক বেশি ভালোবাসে আমাকে, কিন্তু টাকা পয়সার অভাবে অনেক কিছুই করতে পারেননি। আমার মায়ের কথা বিশ্বাস করে, আশায় বুক বেঁধে নিলাম। সত্যিই হয়তো পাবো আমি। দিন যায়, বছর যায়, আমি একটু একটু বড় হই প্রতি বছর। কিন্তু সাইকেল আর আসে না। কিছু না পারতে একদিন আম্মাকে জিজ্ঞেস করেই ফেললাম, “আমাকে কি আর সাইকেল কিনে দিবা না?”

আম্মার কষ্ট আমি ছোটবেলা থেকেই বুঝতাম! তাই তার চোখ দেখেই বুঝে নিতাম যে, হয়তো এটা তার হাতে নেই! একদিন আম্মা খাওয়ার টেবিলে, সাইকেলের কথা তুললে, আব্বা এক পর্যায়ে পারলে আমাকে আর আম্মাকে মেরেই ফেলে…আমি ভাবলাম! থাক! বাদ দেই…আম্মাকে বললাম, “আম্মা আমার সাইকেল লাগবে না’।

আশে পাশে অনেকের সাইকেল ছিল, কিন্তু কেঊ চালাতে দিতো নাহ! আর আমিও মন থেকে এই ব্যাপারটা ভুলতে শুরু করলাম। এক শীতে দাদার বাড়িতে গিয়ে দেখি, চাচার ছেলের একটা বাইসাইকেল। মজাই লাগলো…ভাবলাম চালাবো। এরই মাঝে আমার এক চাচী এসে বলল, আমার বাবা নাকি রাজীব (আমার চাচাতো ভাই) এর জন্মদিনে ওকে উপহার দিয়েছে। আব্বা ওকে বেশি ভালোবাসতো সেটা আমি জানতাম, কারণও ছিল। ও একটা ছেলে…আর আব্বার ছেলে বাচ্চা পছন্দ। আর তাই আমি ওকে অপছন্দও করতাম অনেক। কিন্তু ব্যাপারটা আমাকে এতো লজ্জায় ফেলে দিয়েছিলো…যে সেই সাইকেলে আর হাত দেয়ার রুচিও হল না, সেদিনই শেষ। প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, আর কোনোদিন কিছুই চাইব না কারো কাছে…চাইনি!

বড় হলাম, প্রিয়জন খুঁজে পেলাম। ততদিনে একটা সাইকেল কেনার ক্ষমতা আমারও হয়েছে…কিন্তু সেই যে অভিমান! পুষে রাখলাম অপমান ভেবে! ভাবলাম যে, হয়তো সাইকেলের সাথে সেই পুরনো হিসাবটা হয়তো মেলাতে পারব এবার!

মজার ব্যাপার, সেবারও পারিনি মেলাতে।! তারও সকল ভালোবাসা তার ভাইয়ের ছেলে, বাবা, বান্ধবীর ছেলেকে ঘিরে…কেমন না দুনিয়া? তার যুক্তিগুলো ছিল আরও অযৌক্তিক! কিন্তু কি আসে যায় বলুন?

আমার এখন বয়স ৩০, তবুও আজ আমি সাইকেলে চড়লে আমার মন ভাল হয়ে যায়! পাওয়া না পাওয়া নিয়ে আমার কোন কষ্ট নেই! খালি মাঝে মাঝে মনে হয়, এই সামান্য জিনিষ আমাকে এখনও খুশি করার ক্ষমতা রাখে?

ভালোবাসা শেষ হয় না কখনই! খালি সেটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হয়! আর অনেক সময় না রাখলেও সত্যিকারের ভালোবাসা থেকেই যায়। হয়তো কখনও পাওয়া হয় না!

You Might Also Like

No Comments

Leave a Reply